অনিশ্চিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অন্ধকারে বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার অংশ হিসেবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গত বছর সমন্বিতভাবে সুদহার কমিয়েছিল।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার অংশ হিসেবে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গত বছর সমন্বিতভাবে সুদহার কমিয়েছিল। ঋণের খরচ কমানোর এমন প্রবণতা ছিল ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম। সামগ্রিক এ প্রচেষ্টা মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সফলও হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলতি বছরের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার পরিবর্তনে নির্দিষ্ট কোনো প্রবণতা অনুসরণ করেনি। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকরাও বৈশ্বিক অর্থনীতির ব্যাপারে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ফলে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। খবর রয়টার্স।

সুদহারের বিষয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। বিশ্বের শিল্পোন্নত ও প্রভাবশালী ১১ অর্থনীতির জোট জি১০। গত মাসে এ জোটভুক্ত চার দেশ বৈঠকে বসেছিল। এর মধ্যে সুইডেন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ও কানাডা তাদের সুদহার কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে জাপান এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সুদহার বাড়িয়েছে। দেশটিতে সুদহার বাড়ানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

অন্যদিকে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) এবং নরওয়ের নরজেস ব্যাংক সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড সুদহার বিষয়ে গত মাসে কোনো বৈঠক করেনি। তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) গত সপ্তাহে সুদহার কমিয়েছে।

গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে ফিরেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় করেছেন তিনি। নির্বাহী আদেশে একের পর এক বাণিজ্য শুল্ক আরোপ এবং বহুপক্ষীয় চুক্তি ও নিয়মনীতি বাতিলের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন এ রিপাবলিকান।

এরই মধ্যে চীনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেও তা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব কানাডা সতর্ক করেছে, এসব বাণিজ্যিক পদক্ষেপ তাদের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও দেখতে চাইছে, হোয়াইট হাউজ থেকে কী ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৮টি উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে জানুয়ারিতে তিনটি দেশ সুদহার কমিয়েছে। অন্যদিকে একটি দেশ হার বাড়িয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ছয়টি গত মাসে কোনো বৈঠক করেনি।

গত সপ্তাহে তুরস্ক তাদের সুদহার আরো ২৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটির সুদহার এখনো ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। একে অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়া মাত্র ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমিয়েছে।

অন্যদিকে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দেশটি ঋণের বোঝা নিয়ে উদ্বিগ্ন, ফলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়িয়েছে। জানা গেছে, আগামী মার্চে আরো একবার সুদহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে দেশটি। সম্প্রতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী কমিটি কোপম সর্বসম্মতভাবে ঋণের সুদহার ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন প্রধান গ্যাব্রিয়েল গালিপোলোর সভাপতিত্বে এটাই ছিল প্রথম বৈঠক।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বাণিজ্য শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি)। ফলে সুদহার পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা। এক্ষেত্রে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে চায় দেশটির নীতিনির্ধারকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপান ছাড়া বেশির ভাগ দেশ ২০২৫ সালে সুদহার আরো কমানোর পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ আরো তীব্র হলে ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতিগুলো নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ট্রাম্পের নীতির কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত হুমকি যুক্ত হয়েছে। ফলে আরো সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভও সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহারের ব্যাপারে ভিন্ন পথ অনুসরণ করলে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমস্যার কারণ হতে পারে। কারণ এটি তার পরিকল্পিত বাণিজ্য শুল্কের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। এমনকি এতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ঋণগ্রহণের খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

আরও